শনিবার । ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ । ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩

হামের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন সচেতনতা ও সঠিক যত্ন

মোঃ রমজান আলী

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রায় নিয়ন্ত্রণে চলে আসা এ সংক্রামক রোগটি নতুন করে ছড়িয়ে পড়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এর ঝুঁকি বেশি হওয়ায় পরিবার ও সমাজ পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিক যত্ন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এর নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক নাই, সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা নিয়মিত টিকা গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা। একসময় হাম ছিল বাংলাদেশের অন্যতম জনস্বাস্থ্য সমস্যার একটি প্রধান কারণ। তবে টিকাদান কর্মসূচি, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সরকারের ধারাবাহিক উদ্যোগের ফলে এটি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। Measles বা হাম মূলত এক ধরনের ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট, যা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি-কাশি দিলে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং খুব সহজেই অন্যদের সংক্রমিত করে। সাধারণত জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া প্রধান লক্ষণ। হামকে অনেকেই সাধারণ রোগ হিসেবে মনে করলেও বাস্তবে এটি মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) ঘটায়, যা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে গত কয়েক বছরে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ছেদ পড়ায় হামের প্রকোপ সৃষ্টি হয়েছে। COVID-19 মহামারির সময় অনেক জায়গায় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছিল। অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি পরে সেই ‘মিসড চাইল্ড’ গুলো ঝুঁকিতে রয়ে গেছে। গ্রামাঞ্চল বা দুর্গম এলাকায় টিকাদান কাভারেজ কম, কিছু পরিবার অবহেলা বা অজ্ঞতার কারণে টিকা নেয় না, ফলে ইমিউনিটি গ্যাপ সৃষ্টি করে সংক্রমণ বাড়ায়। অনেক অভিভাবক টিকার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নিয়ে অযৌক্তিক ভয় পান। টিকা দিলে অসুস্থ হয় এমন ভুল ধারণা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার কারণে কিছু মানুষ সচেতনভাবে টিকা এড়িয়ে যায়, যা রোগ বিস্তারের ঝুঁকি বাড়ায়। বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। স্কুল, হাট-বাজার, গণপরিবহণ, বস্তি বা ঘিঞ্জি বসতি এলাকায় একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সহজেই অনেককে সংক্রমিত করতে পারে। অপুষ্ট শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। ভিটামিন ‘এ’এর অভাবে পর্যাপ্ত পুষ্টির ঘাটতিতে তারা সহজে আক্রান্ত হয় এবং জটিলতাও বেশি হয়। হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার না মানা এবং অসুস্থ শিশুকে আলাদা না রাখায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায়। সীমান্তবর্তী এলাকা ও শহরমুখী জনসংখ্যার ফলে সংক্রমণ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। কিছু ক্ষেত্রে রোগ শনাক্ত হলেও দ্রুত রিপোর্ট বা ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, ফলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বিলম্ব হয়। বাংলাদেশে হামের প্রকোপ বাড়ার মূল কারণ টিকাদানের ঘাটতি, সচেতনতার অভাব, অপুষ্টি ও জনসংখ্যার ঘনত্ব।

বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকার জরুরি ভিত্তিতে ১৮টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলা ও ৩০টি উপজেলায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে মাঠপর্যায়ে মনিটরিং জোরদার, আইসোলেশন বেড প্রস্তুত, ভ্যাকসিনের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করে টিকাদান কর্মসূচি গতিশীল করা হয়েছে। সরকারিভাবে ৫ এপ্রিল ২০২৬ থেকে ১৮টি ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য হাম-রুবেলা (MR) জরুরি ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় হামের টিকার প্রথম ডোজ নেওয়ার বয়স নয় মাস থেকে কমিয়ে ছয় মাস করা হয়েছে। ঢাকা ও কক্সবাজারসহ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি এবং শূন্য-ডোজ (Zero-dose) বা টিকা না পাওয়া শিশুদের চিহ্নিত করে টিকা দেওয়া হচ্ছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল গুলোতে আইসোলেশন ওয়ার্ড স্থাপন এবং সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সুবিধা প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। জরুরিভিত্তিতে টিকা কেনার জন্য বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হাম নিয়ে আতঙ্ক না ছড়িয়ে, বাচ্চার জ্বর হলে স্থানীয় ওষুধের দোকান থেকে চিকিৎসা না নিয়ে সরাসরি হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে নেয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক সংস্থা UNICEF, World Health Organiæation এবং গ্যাভি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। তারা টিকা সরবরাহ, প্রশিক্ষণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।

বাংলাদেশের বাজারে সরকারিভাবে এমআর ও বেসরকারিভাবে এমএমআর দুই ধরনের হামের টিকা পাওয়া যায়। সরকারিভাবে ই.পি.আই শিডিউল অনুযায়ী দুই ডোজ টিকা দেওয়া হয়, প্রথম ডোজ নয় মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ পনেরো মাস বয়সে। নিয়মিত দুই ডোজ টিকা নিলে, হাম রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে টিকা ৯৭-৯৯ শতাংশ কার্যকরী। মায়ের শরীর থেকে প্রাপ্ত (প্যাসিভ/পরোক্ষ) অ্যান্টিবডির মাধ্যমে নবজাতকের শরীরে তৈরি হওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শিশুকে সুরক্ষা দেওয়ায় নয় মাস বয়সের আগে শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয় না। তবে, ক্ষেত্র বিশেষে ছয় মাসের পর হতে হামের টিকা দেওয়া যেতে পারে (যেমন : হামের প্রার্দুভাবের সময়, যখন শিশুদের ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইন করা হয়)। তবে সেক্ষেত্রে অবশ্যই পরবর্তীতে নয় মাস এবং ১৫ মাসে বয়সে যথারীতি দুই ডোজ টিকা দিতে হবে। যদি কেউ ই.পি.আই শিডিউল অনুযায়ী টিকা না দিয়ে থাকেন, তবে সম্পূর্ণ দুই ডোজ টিকা দিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রথম ডোজের নূন্যতম এক মাস পরে দ্বিতীয় ডোজ দিতে হবে। যে সব শিশুর বয়স দুই বছর কিন্তু তাকে হামের ১ম ডোজ টিকা দেওয়ার পর দ্বিতীয় ২য় ডোজ টিকা দেওয়া হয়নি, সেক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব ২য় ডোজ টিকা দিতে হবে। কিশোর-কিশোরী অথবা বড়রা হামের টিকা নিতে পারবেন, যদি ইতঃপূর্বে হামের কোনো টিকা গ্রহণ না করে থাকেন এবং গবধংষবং ঝবৎড়ষড়মু ঃবংঃ ঘবমধঃরাব হয়। গর্ভবতী মহিলা ও খুবই কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন রোগীদের ক্ষেত্রে হামের টিকা দেওয়া যাবে না। আপনার শিশুকে নিয়মিত টিকা দিন ও যত্ন নিন এবং হামের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে অতিসত্বর নিকটস্থ হাসপাতাল অথবা শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

হাম হলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, তবে অবহেলা করা বিপজ্জনক। সঠিক যত্ন নিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে। রোগীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে হবে এবং তরল ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জ¦র কমানোর ওষুধ ব্যবহার করতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে এবং চোখে সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা জরুরি। জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। আমরা জানি, প্রতিরোধই সর্বোত্তম উপায়। হাম প্রতিরোধে নির্ধারিত সময়ে শিশুকে টিকা দেওয়া এবং অপুষ্টি দূর করাসহ অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শিশুকে টিকা দেওয়া মানে শুধু তাকে নয়, পুরো সমাজকে সুরক্ষিত করা। হাম প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা কিন্তু টিকা নেওয়ার পাশাপাশি জনসচেতনতা ও সঠিক যত্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আক্রান্ত হলে শিশুকে আলাদা রাখতে হবে, যাতে অন্যরা সংক্রমিত না হয়। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ রোগমুক্তির জন্য সহায়ক। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্ট হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য খুবই উপকারী, যা জটিলতা কমাতে সাহায্য করে।

সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, পরিবার, স্কুল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে হবে। হামের প্রকোপ ঠেকাতে শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা, গুজব প্রতিরোধ করে সঠিক তথ্য ছড়ানো এবং শিশুদের পুষ্টি ও যত্ন নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে গণমাধ্যম ও স্থানীয় প্রশাসন এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা, সভা-সেমিনার ও গণসচেতনতা কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণকে টিকার গুরুত্ব সম্পর্কে জানানো হচ্ছে। স্কুল, মসজিদ ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে প্রত্যেক পরিবার এ বিষয়ে গুরুত্ব দেয়। আমরা সচেতন থাকলে সময়মতো শিশুকে টিকা দেওয়া ও লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া যায়। একজন শিশুর টিকা না নেওয়া শুধু তার নিজের জন্য নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ একজন সংক্রমিত ব্যক্তি সহজেই অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে দিতে পারে। তাই প্রত্যেক অভিভাবকদের দায়িত্ব শিশুকে সময়মতো টিকা দেওয়া এবং অন্যদেরও এ বিষয়ে সচেতন করা। সরকার এবং সর্বস্তরের জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ প্রকোপ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ হলেও সচেতনতার অভাব এবং অবহেলার কারণে এর প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই এই রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। সচেতনতা ও সঠিক যত্ন নিশ্চিত করতে পারলেই হামের প্রকোপ অনেকাংশে কমানো যাবে। প্রতিটি পরিবার যদি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তবে একটি সুস্থ, নিরাপদ এবং রোগমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। হাম কোনো আতঙ্কের বিষয় নয়। সঠিক যত্ন, নিয়মিত টিকাদান এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারলেই হাম প্রতিরোধ সম্ভব। একটি সুস্থ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ একটি শিশুর সুস্থতা মানেই একটি জাতির সুস্থতা।

লেখক : সহকারী তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, খুলনা।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন